বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও দৃঢ় করা এবং শিল্পখাতে পণ্য সরবরাহের সময়সীমা কমানোর লক্ষ্যে দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন–এফটিজেড) স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বেজার গভর্নিং বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
সভা শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সাংবাদিকদের জানান, আনোয়ারায় প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমির ওপর এই ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো কার্যকরভাবে ফ্রি ট্রেড জোনের ধারণা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রস্তাবিত এ অঞ্চলটি কাস্টমস ব্যবস্থার বাইরে একটি অফশোর টেরিটরির মতো কাজ করবে। ফলে সেখানে সংরক্ষিত পণ্যের ওপর কোনো শুল্ক প্রযোজ্য হবে না এবং পণ্য মজুদ, পুনঃরপ্তানি কিংবা উৎপাদনের সুযোগ থাকবে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ আরও বলেন, ‘ফ্রি ট্রেড জোন বলতে আমরা এমন একটি এলাকা বুঝি, যেখানে পণ্যের ওপর কোনো ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয় না।’
এফটিজেড প্রতিষ্ঠার অন্যতম কৌশলগত উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল সরবরাহে সময়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির ক্ষেত্রে অর্ডারের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা দ্রুত ডেলিভারিভিত্তিক রপ্তানি আদেশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, তুলার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এফটিজেডে আগেই সংরক্ষণ করা যাবে। যেহেতু অঞ্চলটি কাস্টমসের আওতার বাইরে থাকবে, তাই স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে এসব কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারবে। প্রয়োজনে ভিয়েতনামের মতো অন্যান্য দেশেও পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে। এর ফলে বাজারে পণ্য পৌঁছাতে সময়সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এই উদ্যোগের বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান দুবাইয়ের জেবেল আলী ফ্রি জোনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, প্রায় ১৪ হাজার একর আয়তনের এ ফ্রি জোন একাই প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালনা করে, যা বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য পরিমাণের চেয়েও বেশি। এছাড়া দুবাইয়ের মোট জিডিপির প্রায় ৩৬ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।
বাংলাদেশও অফশোর বাণিজ্যনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তুলে একই ধরনের সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে নীতিগত অনুমোদন মিললেও এফটিজেড স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। পাশাপাশি ফ্রি ট্রেড জোন বাস্তবায়নে বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে, যা পরবর্তী সরকার সময় নিয়ে বাস্তবায়ন করবে বলে জানান তিনি। চলতি বছরের মধ্যেই প্রাথমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জনের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন চৌধুরী আশিক মাহমুদ।
এদিকে একই সভায় বেজার গভর্নিং বোর্ড মিরসরাইয়ে একটি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, মিরসরাইয়ে প্রায় ৮০ একর জমিতে এ পার্ক গড়ে তোলা হবে। এর আগে জমিটি ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রকল্পটি বাতিল হওয়ায় জমিটি প্রতিরক্ষা শিল্প পার্ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তা বেজার মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশও এ খাতে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি এই পার্কের মাধ্যমে দেশের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক যুদ্ধবিমান নয়, বরং গুলি বা ট্যাংকের অ্যাক্সেলের মতো মৌলিক সরঞ্জামের সংকটই বড় সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই এ ধরনের সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বেজা, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ আলোচনার ফলেই এ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে বলে জানান তিনি। নীতিগত অনুমোদনের পর জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল মাস্টারপ্ল্যানে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক অন্তর্ভুক্ত করার কাজ দ্রুত শুরু হবে।
এ ছাড়া সভায় কুষ্টিয়া চিনিকলকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প পার্কে রূপান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে অনেক চিনিকল কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়া চিনিকলের জমি ব্যবহার করে বেজার তত্ত্বাবধানে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।