রহিম সৈকত ◾
পাহাড়ের ঢালে ঢালে সবুজের সারি। কোথাও কোমল চা-পাতা, কোথাও শ্রমিকের ব্যস্ততা, আবার কোথাও পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে চলেছে দর্শনার্থী। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত চাঁদপুর-বেলগাঁও চা বাগান এখন শুধু চা উৎপাদনের কেন্দ্র নয়; প্রকৃতি, শ্রম, অর্থনীতি ও পর্যটনের এক অনন্য সমন্বয়স্থল।
চা বাগান সূত্রে জানা যায় প্রায় ৩ হাজার ৪৭২ একর বিস্তৃত এই চা-বাগানের চা আবাদি এলাকা বর্তমানে ৮৩৩ একরের কাছাকাছি। ২০২৫ সালে বাগানটি প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কেজি চা উৎপাদনের মাইলফলক ছুঁয়েছে। ২০২৬ সালে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৪ লাখ কেজি।
এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনা ও শ্রম। বাগানের ব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার ২০০৬ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে এখানে যোগ দেন এবং ২০১৬ সালে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব নেন। তাঁর দায়িত্বকালে চা আবাদ ও উৎপাদন বাড়ার কথা একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বর্তমানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৭০০ শ্রমিক এখানে কাজ করছেন বলে তিনি জানান।
আবুল বাশারের ভাষায়, “২০২৫ সালে ৪ লাখ কেজি চা পাতা উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে।” তাঁর আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ২০২৬ সালের সাড়ে ৪ লাখ কেজির লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হবে।
চাঁদপুর-বেলগাঁওয়ের আরেকটি পরিচয় তৈরি হয়েছে উন্নতমানের ক্লোন চা উৎপাদনের কারণে। ২০২৫ সালের উৎপাদন ও মানের দিক দিয়ে বাগানটির জাতীয় পর্যায়ে ভালো অবস্থানের কথা উঠে এসেছে। তবে এ ধরনের র্যাঙ্কিংয়ের নির্দিষ্ট সরকারি তালিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় এটিকে এখানে চূড়ান্ত সরকারি অবস্থান হিসেবে দাবি করা যাচ্ছেনা না।
চা-বাগানের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে পর্যটন সম্ভাবনা। সবুজ পাহাড়ের ঢালে চায়ের সারি দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা আসেন। ২০২৫ সালের একটি প্রথম আলো প্রতিবেদনে দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীদের বাগানে আসার কথা উঠে এসেছে। বাঁশখালীর পাহাড়, সমুদ্র ও চা-বাগান—এই তিন বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে থাকায় পর্যটনের জন্য এলাকাটির স্বাতন্ত্র্যও তৈরি হয়েছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সমস্যাও আছে। বাগানের ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, চারপাশে পর্যাপ্ত বেড়া না থাকায় হাতির পাল প্রায়ই বাগানে ঢুকে পড়ে, এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পাশাপাশি বাগানে যাওয়ার সংযোগ সড়কের সংস্কারও দীর্ঘদিনের দাবি।
ইতিহাসের দিক থেকেও বেলগাঁও চা-বাগান আলাদা গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন স্থানীয় ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ১৯১২ সালে ব্রিটিশ আমলে বাগান প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও, বাগানের ব্যবস্থাপক ১৯৮৫ সালে ৬৪০ একর জমির ওপর বাগান গড়ে ওঠার তথ্য দিয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
একসময় পাহাড়ের সবুজে হারিয়ে থাকা এই বাগান এখন বাঁশখালীর অর্থনীতি ও পর্যটনের সম্ভাবনার প্রতীক। চা-পাতার প্রতিটি কুঁড়ির সঙ্গে যেমন শ্রমিকের ঘাম মিশে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে একটি জনপদের নতুন সম্ভাবনার গল্প।
Leave a Reply